“…আসল মানুষটা লুকিয়ে থাকে জামাকাপড়ের পেছনে। যত দামী আর জমকালো তার জামার বাহার, তত ভঙ্গুর তার ঈগো। কিন্তু ফ্যাশন ডিজাইনারদের কথা আলাদা। তাঁরা (সিরিয়াস ফ্যাশন ডিজাইনারদের কথা বলছি) তাঁদের যন্ত্রণা, আনন্দ, লজ্জা সব ফুটিয়ে তোলেন এই সাজে। সেটা তখন সবকিছু ছাপিয়ে হয়ে ওঠে আর্ট। আর সেইজন্যেই, সেই বোরিং, একঘেয়ে ফর্ম ভাঙার জন্যেই, মডেলরা হয়ে উঠতে চায় অভিনেতা, আর নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় মূলধারার ছবিতে আসতে। উল্টোদিকে, মূল ধারার অভিনেতারা অভিনয়ের চাপ সামলাতে না পারলে মডেলিংয়ে চলে যায়, যেখানে তারা তাদের ক্রিয়েটিভ স্পেস পেতে পারে।”

– T. F. Shelby, Esq.

– ত. ফ. শেলবী, এস্কোয়‍্যার।

Advertisements

LoL

“Mirror, mirror, on the wall –

Who’s the bravest of them all?”

“Oh, Poor Human, on the wretched side,

Why don’t you just go and run and hide?”

শাশ্বতী

পর্ব: এক।

______________________________

“শ্রান্ত বরষা, অবেলার অবসরে,

প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া;

স্বর্ণ সুযোগে লুকাচুরি-খেলা করে

গগনে গগনে পলাতক আলো-ছায়া।

আগত শরৎ অগোচর প্রতিবেশে;

হানে মৃদঙ্গ বাতাসে প্রতিধ্বনি:

মূক প্রতীক্ষা সমাপ্ত অবশেষে,

মাঠে, ঘাটে, বাটে আরব্ধ আগমনী।

কুহেলীকলুষ, দীর্ঘ দিনের সীমা

এখনই হারাবে কৌমুদীজাগরে যে;

বিরহবিজন ধৈর্যের ধূসরিমা

রঞ্জিত হবে দলিত শেফালিশেজে।

মিলনোৎসবে সেও তো পড়েনি বাকী;

নবান্নে তার আসন রয়েছে পাতা;

পশ্চাতে চায় আমারই উদাস আঁখি;

একবেণী হিয়া ছাড়ে না মলিন কাঁথা ।।”

সুধীন্দ্রনাথের কবিতার যেটা signature বলা যেতে পারে, সেটা হল পরিশীলিত, তৎসম-ঘেঁষা বাংলা (কমলকুমার দ্রষ্টব্য) ভাষা। প্রকৃতিতে রাবীন্দ্রিক বলে মনে হলেও একটু খুঁটিয়ে দেখলে (এবং সুধীন্দ্রনাথের সম্পর্কে একটু আগে থাকতে জানাশোনা থাকলে) বোঝা যাবে, এর পুরোটা সত্যি নয়। উভয়ের উৎস এক – সংস্কৃত। উভয়েই সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছেন নিবিষ্ট মনে, ফলতঃ উভয়েই অসামান্য ধী এবং কল্পনা শক্তি-বলে নিজের মতন করে বাংলা ভাষাকে তৈরী করেছেন। গড়ে-পিটে নিয়েছেন বলা যেতে পারে। সুধীন্দ্রনাথ কালের নিয়মেই রবীন্দ্রনাথের কাছে ঋণী, অথচ নিজস্ব প্রতিভায় ভাস্বর।

Man truly achieves his full human condition when he produces without being compelled by the physical necessity of selling himself as a commodity.

Che Guevara, Man and Socialism in Cuba

“বিংশ শতাব্দীর সবচাইতে পরিপূর্ণ মানুষ” চে, মানুষ হতে পারার বাস্তবানুগ সংজ্ঞা দিয়ে গিয়েছেন, নতুন এক দেশ গড়ার প্রাক্কালে। বাংলা ভাষার সৌভাগ্য যে আমাদের তলস্তয় ও নবোকভ উভয়েই বিদ্যমান, ঋষির প্রাচীনত্ব ও সজনীকান্তসম লেখনীর ক্ষুরধার নিয়ে। সুধীন্দ্রনাথ আঁকছেন বেলাশেষে বাদলের ছবি –

“শ্রান্ত বরষা, অবেলার অবসরে,

প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া;”

এই দুটি পংক্তি লক্ষ্য করুন। যতিচিহ্ন যথাসম্ভব মূলের অনুগ রাখবার চেষ্টা করেছি, কারণ আমার ধারণা, কবির সংস্কৃত শিক্ষার মধ্যে ওঁর যতিচিহ্ন ব্যবহারের প্রতি পরিমিত দুর্বলতা থাকবে। যতিচিহ্ন যে (ব্যাকরণগতভাবে ছাড়াও) ভাষার মাধুর্যটুকু গোপনে লুকিয়ে রেখে দিয়ে হঠাৎ করে একটা-দুটো পেয়ে যাওয়া এলাচের টুকরো মুখে পড়ে যাবার মতন গোপন স্বাদ এনে দেয়, সেটা আসল লোকের মুখে না শুনলে ঠিক বোঝা যাবে না।

আর তার জন্যে বলতে পারা চাই। ওয়াইল্ডের মতন। পুনরায় সৈয়দচারণে প্রাপ্ত, ওয়াইল্ড নাকি মধ্যে মাঝে কোনো একটা শব্দ, ইচ্ছে করেই, ভুলে যাবার ভান করতেন, আর তারপরেই যেন হঠাৎ মনে পড়েছে, এমন করে বলে উঠতেন, শুধুমাত্র শব্দটার উপর জোর দেবেন বলে। (আমি ওয়াইল্ড নই, কিন্তু মাঝেমধ্যে মজা করার জন্য কথা বলার মাঝখানে এই ইচ্ছে-করে-ভুলে-যাওয়া খেলাটা করে দেখেছি, খাসা এফেক্ট হয়। মহাজনোগতস্য পন্থাঃ ইত্যাদি)

শ্রান্ত বরষা। বর্ষা, কখন শ্রান্ত হয়? অঝোরে ঝরে পড়তে থাকে, সীমাহীন, ক্লান্তিহীনভাবে, তারপরে হঠাৎই এক সময়ে, মেঘ ফুরিয়ে এলে থেমে যায় আপনা থেকে। অবেলার অবসরটুকু বোধ করি বাংলাদেশে না থাকলে বোঝা সম্ভব নয়। অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারা মাঝে, দাওয়ায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে, ক্লান্ত চোখে বসে থাকা গৃহবধূ আনমনে দেখছে, কেমন করে আকাশের ওই কালো নেমে এল মাটির বুকে। কালো ঘোড়ার মতন ফেনা-তোলা ফুঁসতে থাকা মেঘ, সমস্ত গর্জন-বর্ষণ-শেষে, ছড়িয়ে, গলে পড়ে আছে সারা আকাশ জুড়ে, আর তার ছায়া ছড়িয়ে গিয়েছে চরাচর ব্যেপে। কেবল ওই কোণে গৃহস্থের এক চিলতে উঠোনটির উপর বুঝি আর তার কোনো আক্রোশ নেই।

(চলবে)

Stardust

“My dreams shall know no bounds, at least until bullets decide otherwise. I’ll be expecting you, sedentary gypsy, when the smell of gunpowder subsides. A hug for all of you, Che.”

“এ যে দৃশ্য দেখি অন্য, এ যে বন্য, এ অরণ্য।

হেথা দিনেতে অন্ধকার, হেথা নিঃঝুম চারিধার,

হেথা ঊর্ধ্বে উঁচায়ে মাথা দিল ঘুম –

যত আদিম মহাদ্রুম।”

La Malagueña

“নো নো নো নো নো, দ্যাটস ফেইক। আই ক্যান নত আন্দারস্ট্যান্ড, হাউ ইউ গাইজ লিসন তু অল দিজ বিউটিফুল সংস, অ্যান্ড নত ইন দেয়ার ওরিজিনাল ভার্শান”, বলছিল লুসিয়া। লুসিয়া পুয়েন্তে, চল্লিশের কোনো একটা দিকে বয়স, মেহিকানা, শান্তিনিকেতনে পড়েছে, অসম্ভব রবীন্দ্রনাথ অনুরাগিণী, কেরালায় কয়েক বছর কাটিয়েছে, ফ্লুয়েন্ট মালয়ালম বলতে পারে, বাংলা জানে একটু আধটু (“আর একটু বেশি দিন থাকলে, বুঝলে, শিখে নিতাম বাংলা। কী সুন্দর ল্যাঙ্গুয়েজ! অ্যান্ড টেগোর সংস, দোজ আর মাই ফেভারিট”), আর অনবরত হাসে। ল্যাটিন রক্ত বইছে শরীরে, দুম করে রেগেও যায়, আর রেগে গেলে ল্যাটিনাদের যে ঘাঁটাতে নেই, সেটা…

পাশে হাঁটছে টমাস, আমার তখন-রুমমেট। সেও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছে দেখলাম। মিনমিন করে বললাম “আচ্ছা, এই যে এখানে লোকজন বলিউড মিউজিক শোনে, আর সেটাকেই ইন্ডিয়ান মিউজিক বলে জানে, সেটাও তো একই রকম ব্যাপার না খানিকটা? তাহলে শোধবোধ, কি বলো?”

লুসিয়া দেখলাম একটু ঠান্ডা হল। তারপর বলল, “সে তো সব দেশেই অমন হয়। আমার ভয়ানক রাগ হয় এইসব অসাধারণ মিষ্টি গানগুলোকে এইভাবে বুচার করলে। এই আমেরিকানগুলো…”

শুরু হয়ে গেল আমেরিকানদের মুণ্ডুপাত। টমাস, আমার তৎকালীন রুমমেট এবং অন্যতম ক্লোজ বন্ধু, এক মধ্যবয়সী সাদা আমেরিকান; কিন্তু মনেপ্রাণে এশিয়ান। মাঝে মধ্যে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় ওর এশিয়া এবং এশিয়ানদের প্রতি ভালবাসা, যেটা খানিক বিরক্তিকর, সেও যোগদান করেছে। আমি বেগতিক দেখে বললাম – “তা বেশ। কিন্তু ইয়ে, আমার এই Chingónized ভার্শনটাই বেশি ভালো লাগে।” লুসিয়ার মুখের দিকে চেয়েই ঝটপট যোগ করলাম “মানে এই কমার্শিয়াল ভার্শনগুলোর মধ্যে আর কি!”

আমরা হাঁটছিলাম স্ট্যান শেরিফ সেন্টারের পাশের পার্কিং লটের মধ্যে দিয়ে। স্ট্যান শেরিফ সেন্টার হল ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াইয়ের স্টেডিয়াম। সেখান থেকে হেঁটে বড় রাস্তায় পড়লাম, লুসিয়াকে বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্যে। হাঁটতে হাঁটতে লুসিয়া বলল, “কখনো পারলে এই গানটার পঞ্চাশের দশকের rendition টা শুনো। বুঝবে।”

আমি কিছু না বলে মাথা নাড়লাম। বেশ বুঝতে পারছি, লুসিয়া নস্টালজিক হয়ে পড়েছে। ব্যাপারটা খানিকটা “আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা”-র মধ্যে ইলেকট্রিক গীটার আর ড্রাম ঢোকানোর মতোই বেদনাদায়ক। কিন্তু আমি একে মিলেনিয়াল, তায় বিদেশী, তার উপর ছোটবেলা থেকে হলিউডের রঙিন কাঁচে দুনিয়া দেখা আনকালচার্ড ছোঁড়া, আমার পক্ষে সামান্য empathize করা ছাড়া আর কিছু করা সম্ভব নয়।

প্রথম এই গানটা (বলা ভালো সুরটা) শুনেছিলাম গীটারে। আন্তোনিও বেন্দেরাস, একটা সদ্য তৈরী হওয়া গীটারে বাজাচ্ছেন এলোমেলো। ক্যামেরায় প্রথমে ওঁর মুখ বাদ দিয়ে দেখাচ্ছে, গীটারটা হাতে ধরে পরখ করছেন কিরকম সুর বেরোয়। কয়েক সেকেন্ড বাজিয়ে মাথা নাড়লেন গীটার প্রস্তুতকারকের দিকে, খুশি হয়েছেন দু’জনেই। তারপরে পেছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে বাজাচ্ছেন, আর গীটারের সাথে সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকেও বাজছে, La Malagueña, যেটাকে গোটা দুনিয়া Malagueña Salerosa নামেও চেনে। লম্বা চুল চোখের উপর এসে পড়েছে, পরণে কালো জ্যাকেট, ট্রাউজার, আর স্পার বসানো কালো জুতো, বেন্দেরাস আর “এল মারিয়াচি” তখন আমার কাছে সমার্থক। নব্বইয়ের গোড়াতে সিক্যুয়েল “দেসপেরাদো” আর ২০০৩ এর “ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মেক্সিকো” দিয়ে যার শেষ। সেই দু’হাজার তিন, যে সময়ে হোস্টেল থেকে আমাদের জনা কয়েক বন্ধু, তখন ক্লাস নাইনের শেষ বা টেনের শুরু, পালিয়ে গিয়ে “ওয়ান্স আপন এ টাইম” দেখতে গেছিল, আর সেই অপরাধে সাসপেন্ড হয়েছিল, সেই সিনেমা। লাতিন আমেরিকা মানেই আমার কাছে তখন, এখনো, কিউবা-চে-ফিদেল-আলেন্দে, লাতিন আমেরিকা মানে এল মারিয়াচি, সালসা-বাচাতা-ট্যাঙ্গো আর আগুন-জ্বালানো ল্যাটিনা, যে আগুনের আঁচ ততদিনে আমার চেনা। “কিল বিল” সিনেমায় উমা থুরম্যান আর লুসি লিউয়ের শেষ লড়াইয়ের কথাটা মনে আছে? তা হলে বুঝবেন  Chingón কী জিনিস। রবার্ট রডরিগেজ, জন্মসূত্রে টেক্স-মেক্স এই মারিয়াচির ব্যান্ড হল Chingón, যার মানে লিটারালি “shit”, এই সমস্ত মারিয়াচি গানের কভার করেছেন, ইলেকট্রিক গীটারে। সে জিনিস শুনেছি আর মনে মনে ভেবেছি, এভাবে কোনোদিন গীটার বাজাতে যদি পারি, জীবন সার্থক! এই গানটা যে আমায় শুনিয়েছিল ইউটিউবে, দু’হাজার চোদ্দ সালে, তখনো জানতাম না এই গানটার নাম, শুধু সুরটা ছাড়া, তার একঢাল কালো চুল, গায়ে ল্যাটিন রক্ত আর কাজলকালো চোখ। তার নাম বলা মানা। আমাকে বলেছিল সে, এই গানের সাথে সে তার quinceañera-য় নেচেছিল, তখন তার পনেরো বছর বয়স। এখন ভাবি, আমার কী ভাগ্য, জীবনে সিনেমার মূহুর্তগুলোও এমনি করে আসে! এ গান এক ব্যর্থ প্রেমিকের, যে মালাগা থেকে আসা এই সুন্দরীর উদ্দেশ্যে বলছে, আমি তোমার জন্যে পাগল, কিন্তু আমি জানি আমি গরীব, সেজন্যে তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করছ, আমি বেশ বুঝতে পারছি তা। এই কথা আমাদের সকলের, যারা প্রেমে ব্যর্থ হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছি, আবার গুছিয়ে নিতে চেয়েছি জীবনটাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতন লুপে চালিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা শুনে গেছি গানটা হেডফোনে, যেন চারপাশে সব থেমে গেছে, সব মিথ্যে, শুধু সত্যি বলতে La Malagueña, মালাগা-র সেই সুন্দরী। আর সব মিথ্যে, স-অ-ব।

মনে পড়ল, লুসিয়ার সাথে আমার প্রথম আলাপের কথা। আমি ইউনিভার্সিটির প্যারাডাইস পামস্ ক্যাফেটেরিয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে, দরজার কাছটায়, কফির অর্ডার করব, গায়ে মেক্সিকান সোয়েটার (সদ্য মেক্সিকো ঘুরে ফিরেছি, সেখান থেকে কেনা)। হঠাৎ শুনি কে জানি জিজ্ঞেস করছে, “পেরদোন? এরেস মেহিকানো?” (এক্সকিউজ মি, আর ইউ মেক্সিকান?) আমি ঘাড় নাড়লাম, “নো।” সাথে সাথে হেসে উঠল লুসিয়া, “দেন ইউ আর ইন্ডিয়ান।” আমিও হাসছি, “কি করে বুঝলে?” বলল, “আরে আমি ঠিক বুঝতে পারি। এতদিন ভারতে কাটিয়েছি…” ব্যস, সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্ব শুরু। হাওয়াই ছেড়ে চলে আসার আগে আমাকে লুসিয়া নেমন্তন্ন করেছিল, “পরের বার মেক্সিকো আসার আগে আমাকে কিন্তু অবশ্যই জানাবে।” আমি কথা দিয়েছি, জানাবো। বন্ধুভাগ্য আমার চিরদিনই ভালো যদিও, দেখি, কোনোদিন যদি পারি, হবে হয়ত…।

তারপর চলে এসেছি হাওয়াই ছেড়ে, সেও কতদিন হয়ে গেল। কিন্তু মালাগা-র সেই সুন্দরী, যার কাজলকালো চোখ, গরীব বলে যে প্রত্যাখ্যান করল সেই মারিয়াচিকে, সে আমার স্মৃতিতে রয়ে গেছে। এখনো চোখ বুজলেই দেখতে পাই, লাল একটা স্কার্ট তার পরণে, আর কালো পোশাকে ঢাকা তার ঊর্ধাঙ্গ, সে তার ডান হাত ছড়িয়ে দিয়েছে হাওয়ায়, আর সপাটে ঘুরেছে একপাক, মরুভূমির বালির ঝড়ের মত। তার একঢাল কালো চুল সাপের মতন ফুঁসে উঠেছে, তার প্রতি পদক্ষেপে উড়ে চলেছে ধুলো। আর একপাশে বসে, জীর্ণ গীটারে সুর তুলেছে গরীব মারিয়াচি, প্রত্যাখ্যাত কিন্তু ধীর, সে জানে তার বাজনার আয়ু যতক্ষণ, ততক্ষণই আয়ু এই নাচেরও, তাই সুরের বাঁধনে সে বেঁধে রাখতে চায় সেই অসামান্য বিদ্যুৎশিখাকে, যার দেহে গোলাপের সারল্য, আর ঠোঁটে এক মহাসাগর তৃষ্ণা, আর সে তৃষ্ণা স্থান কালের নিয়ম ছাড়িয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সকলকে। সে জিনিস স্বর্গের পারিজাতের মতন নিষ্পাপ, মদিরার নেশার মত আকর্ষক, সে তৃষ্ণা যার একবার এসেছে, তার আর রেহাই নেই, মরুভূমিতে জলের আশায় ঘুরে বেড়ানো ছাড়া। মরীচিকার সন্ধান মাঝে মধ্যে মেলে, আর সে আশায় গীটারে সে আবার তোলে সুর, যদি আবার কখনো সে সুন্দরীর দেখা মেলে তার। কারণ সে জানে, আবার কোনোদিন দপ্ করে জ্বলে উঠবে তার চোখ, আর লাল এক ঘূর্ণি তুলে সে শুরু করবে তার নাচ, যে নাচ তার রক্তে। আর গোটা দুনিয়া থেমে যাবে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে। সে নিঃশ্বাস কখন পড়বে, কেউ জানে না, কেউ জানে নি আজও।

ঋণস্বীকার: গুগল, ইউটিউব ও অন্যান্য।

দেবব্রত ও অন্যান্য

এই গানটা শুনছি বেশ কিছুদিন ধরে। শুনছি বলতে, গানের কথাগুলো শুষে নিচ্ছি, আর তার সাথে নতুন করে উপলব্ধি করছি দেবব্রতর ন্যারেশনটুকু। করতে গিয়ে যেটা মনে পড়ছে, সেটা হল ছোটবেলায় আবৃত্তি শেখার সময়ের কথাগুলো। ব্যাপারটা খানিকটা এইরকম হত –

খুদে আবৃত্তিকার: নমস্কার, আমার নাম অমুক। আমি এখন কবি অমুকের (রবীন্দ্রনাথ হলে শুধু কবি বললে চলবে না, বিশ্বকবি বা কবিগুরু বলতে হবে, নজরুল হলে বিদ্রোহী কবি এবং/অথবা কাজী, ইত্যাদি) তমুক কবিতাটি আবৃত্তি করছি।

আবৃত্তির শেষে নমস্কার বলে বেরিয়ে আসা।

ওরই মধ্যে যারা আবার বিচারকদের কাছ থেকে একটু বাহবা পেতে চাইত, তারা গিয়ে কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই আবৃত্তি করত, আবৃত্তি শেষে কবি ও কবিতার নাম বলে নমস্কার করে বেরিয়ে আসত। কম্পিটিশন হলে ব্যাপারটা অতটাও কিছু গুরুতর ছিল না, কারণ আগে থেকেই কী কবিতা আবৃত্তি করতে হবে সেটা বলে দেওয়া থাকত, সুতরাং বিচারকরা জানতেন প্রতিযোগীরা হয় এটা, না হয় ওটা বলবে। আমরা (আমি আর আমার বোন, চন্দ্রিমা) অবশ্য এতসব কায়দাকানুনের মধ্যে যেতাম না, কারণ আমাদের মা-মাসীরা যাঁরা এইসব কম্পিটিশনে নিয়ে যেতেন, তাঁরা এসব ব্যাপারে বেশ ওল্ড স্কুল ছিলেন।

সে যাক। যে কারণে এ প্রসঙ্গের উপস্থাপনা করলাম আবার, তার উদ্দেশ্য হল গানের শুরুতে দেবব্রতর ন্যারেশনটুকু লক্ষ্য করা। দেবব্রতর গান মানেই হারমোনিয়াম, আর এক্ষেত্রে লক্ষ্য করে দেখবেন, সেটা বাজছে একটু উঁচু স্কেলে, যেন দেবব্রতর গলার গাম্ভীর্যের সাথে সঙ্গত করতে। যাঁরা ব্রততীর গলায় “আমিই সেই মেয়ে” কিংবা “যমুনাবতী” শুনেছেন, তাঁরা কিছুটা বুঝবেন। কিন্তু এর চাইতেও ভালো উদাহরণ হল, স্টিভন ফ্রাইয়ের গলায় শার্লক হোমসের অডিওবুক। এক সাক্ষাৎকারে স্টিভন বলছেন, উনি কিভাবে বইয়ের চরিত্রগুলো গলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ওঁর কথাতে বলি, ওয়াটসনের গলায় যেন একটা gravel রয়েছে (যেটাকে আমরা বাংলায় দানাদার, ভারী গলা বলে থাকি, খানিকটা ব্যারিটোন হয়ত বা) আর শার্লকের গলাটা তার চাইতে এক পর্দা উঁচুতে (কারণ হিসেবে আমার মনে হয়, গলা এক পর্দা উঁচু হলে তাতে হোমসের প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্ন সারকাজম খেলে ভালো)। তার মানে, উনি যখন ডার্টমুরের বর্ণনা দিচ্ছেন, তখন উনি কমপক্ষে তিনটে গলা ব্যবহার করছেন, একটা ওঁর নিজের, একটা ওয়াটসনের আর একটা শার্লক হোমসের। যাঁরা আমার মতন শার্লকপ্রেমী (এবং যাঁরা সবকটা গল্প উপন্যাস পড়েছেন), তাঁরা বুঝতে পারবেন আমার উত্তেজনাটা ঠিক কী ধরণের (গো টু অ্যামাজন শপিং -> প্রি-অর্ডার শার্লক হোমস অডিওবুক ন্যারেটেড বাই স্টিভন ফ্রাই -> অ্যাড টু কার্ট ইত্যাদি)।

সে যাক। লিখছিলাম দেবব্রতর গলা নিয়ে।

দেবব্রত বলে চলেন কিছুটা মজলিশি ঢঙে; কোন বয়সে রবীন্দ্রনাথ এ গানটি লিখেছিলেন, ব্রহ্মসঙ্গীত হিসেবে, এই সব। এই ন্যারেশনের শেষে কখন জানি হারমোনিয়াম বদলে যায় পিয়ানোয়, আর কথাগুলি ধীরে ধীরে মিশে যায় গানের স্থায়ীর সঙ্গে,

তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হবো নাকো পথহারা।
যেথা আমি যাই নাকো, তুমি প্রকাশিত থাকো,
আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা।

এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, হারমোনিয়ামের শেষে পিয়ানো ব্যবহার হয়েছে – অর্গ্যান নয়। অর্গ্যানের সুর আমার কানে একটা solemn ব্যাপার নিয়ে আসে, যেটা necessarily পিয়ানোর বৈশিষ্ট্য নয়। অর্গ্যান বলতেই আমার মনে পড়ে একটা বিশাল dome-shaped হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যাথিড্রাল, আর সমবেত প্রার্থনাসঙ্গীত। কখনো যদি আভে মারিয়া শুনে থাকেন, তাহলে খানিকটা বুঝবেন, অর্গ্যানের ব্যবহার কিভাবে হয়েছে। বিবেকানন্দ এক জায়গায় লিখেছেন, পাশ্চাত্য (খ্রীষ্ট) ধর্মের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য হল আমরা পাপী এবং পরমকারুণিক ঈশ্বর আমাদের পাপ হতে রক্ষা করবেন। হয়ত কিছুটা সে কারণেই, খ্রীষ্ট ধর্মসঙ্গীতের মধ্যে এই আকুলতাটুকু রয়ে গেছে (খানিকটা হিন্দু ভক্তিমার্গের মতন কি?), যে আবহটুকু অর্গ্যান তৈরী করে দেয়। যাঁরা “পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান – ডেড ম্যানস চেস্ট” সিনেমাটা দেখেছেন, তাঁদের হয়ত মনে আছে ডেভি জোন্সের পাইপ অর্গ্যান বাজানোর মুহূর্তটুকু। বাইরে উত্তাল সমুদ্র, ঝড়ে উথাল-পাথাল, তারই মধ্যে ডেভি জোন্স বাজিয়ে চলেছে অর্গ্যান। তার হৃদয় ক্যালিপসোর, আর এই ঝড় তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ক্যালিপসোর কথা। সে সুতীব্র বেদনা প্রকাশ করার কাজটুকু পরিচালক ওই তীব্র অর্গ্যানের সুর দিয়েই ছেড়েছেন, ও জিনিস ভাষায় প্রকাশ করা যায় না বলে।

ব্রাহ্মধর্ম, তথা ব্রহ্মসঙ্গীত কিন্তু মূলগতভাবে আলাদা। ব্রাহ্মধর্মের অন্তর নিরাকার বৈদান্তিকের, কিন্তু বাহ্যরূপ পাশ্চাত্যের। তৎকালীন (এবং সমকালীন) হিন্দুধর্ম ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আচারসর্বস্ব, আর সে কারণে ইংরেজদের কাছে এই “হীদেন” হিন্দুধর্ম (দর্শন নয়) খানিকটা অবজ্ঞার পাত্রও বটে। ব্রাহ্মধর্মের প্রবক্তারা যেহেতু সমাজের এলিট শ্রেণী, এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকে আলোকিত, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন রীতি অনেকাংশে ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের দ্বারা অনুপ্রাণিত (রামমোহন, দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ), এবং সেই ধারণা অনুসারে, ব্রাহ্ম উপাসনাগৃহও অতিশয় সাদামাটা এবং আড়ম্বরহীন। সত্যজিৎ রায় তাঁর “যখন ছোট ছিলাম” বইয়ে লিখে গেছেন ব্রাহ্ম উপাসনা পদ্ধতির কথা, আর রবীন্দ্রনাথের “জীবনস্মৃতি” তো আছেই (সেসব কথা খানিক অনাবশ্যক বোধে বাদ দিচ্ছি)।

দেবব্রতর এই ন্যারেশন খানিকটা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। বীরেন্দ্রর উপস্থাপনায় বীররসের আধিক্য, তিনি অসুরদলনী দেবীর আবাহন করছেন “খড়্গিনী শূলিনী ঘোড়া/ গজিনী চক্রিনী তথা/ শঙ্খিনী যাপিনী বাণ…।” অপরপক্ষে দেবব্রত স্থির, শান্ত, কিছুটা যেন relaxed-ও, খানিকটা যেন পড়ন্ত বিকেলে, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের কোনো এক ক্লাসরুমে ডেস্কে সামান্য হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষক পড়িয়ে চলেছেন শেক্সপীয়র, আর গোটা ক্লাস মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছে, যেন পলক পড়লেই সব থেমে যাবে। তাঁর কথা শেষ হয়, আর কোন এক সময়ে পিয়ানো এসে পড়ে, গোটা ব্যাপারটার মধ্যে। পিয়ানো, একটা আশ্চর্য জিনিস। দেবব্রত খানিক থেমে শুরু করেন, যেন ভাসিয়ে দিচ্ছেন গলা,

শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা,
শুধু যাওয়া…।

আমি নিজে নাস্তিক। সাকার, নিরাকার, কোনো ভগবানেই আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু এ গান যখন শুরু হয়, তখন চরাচর থেমে যায় কোন মন্ত্রবলে। গাছের পাতাটিও নড়ে না, যেন হেমন্ত, পিয়ানোর এলোমেলো কয়েকটা নোটের পর শুরু করেছেন,

আমি গান শোনাবো একটি আশা নিয়ে,
সে গান যেন তোমার ভালো লাগে…।

কিন্তু না, তাও তো নয়! ততদিনে দেবব্রত জেনে গেছেন, বিশ্বভারতী তাঁকে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে নিষেধ করেছে। এ আঘাত তিনি যে কিভাবে সামলেছেন, সে কথা আমরা জানি, যখন ঝড়ের রাতে একলা, অভিমানী মানুষটি, গাইতে থাকেন –

জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে!

দেবব্রত কোনো শ্রোতার তোয়াক্কা করেন না, কেবল ওই শুরুর ন্যারেশনটুকু বাদ দিয়ে। ঐটুকুই। ওঁর দায় তারপরে শেষ। তারপর, শুধুমাত্র গেয়ে চলেন রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে, আর আমি বসে থাকি, স্থির। শুনে চলি, গান শেষ হয়েও শেষ হয় না। ভাবি, বাংলা আর ইংরেজি ভাষার গোটা ভোক্যাবুলারিও যথেষ্ট নয়, যা বলতে চেয়েছিলাম তার জন্যে। পুরো ব্যাপারটা যেন ম্যাজিক।

অবাঙমনসোগোচর, বোঝে প্রাণ বোঝে যার।

(ঋণস্বীকার: Google, Youtube ও অন্যান্য)