এই গানটা শুনছি বেশ কিছুদিন ধরে। শুনছি বলতে, গানের কথাগুলো শুষে নিচ্ছি, আর তার সাথে নতুন করে উপলব্ধি করছি দেবব্রতর ন্যারেশনটুকু। করতে গিয়ে যেটা মনে পড়ছে, সেটা হল ছোটবেলায় আবৃত্তি শেখার সময়ের কথাগুলো। ব্যাপারটা খানিকটা এইরকম হত –

খুদে আবৃত্তিকার: নমস্কার, আমার নাম অমুক। আমি এখন কবি অমুকের (রবীন্দ্রনাথ হলে শুধু কবি বললে চলবে না, বিশ্বকবি বা কবিগুরু বলতে হবে, নজরুল হলে বিদ্রোহী কবি এবং/অথবা কাজী, ইত্যাদি) তমুক কবিতাটি আবৃত্তি করছি।

আবৃত্তির শেষে নমস্কার বলে বেরিয়ে আসা।

ওরই মধ্যে যারা আবার বিচারকদের কাছ থেকে একটু বাহবা পেতে চাইত, তারা গিয়ে কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই আবৃত্তি করত, আবৃত্তি শেষে কবি ও কবিতার নাম বলে নমস্কার করে বেরিয়ে আসত। কম্পিটিশন হলে ব্যাপারটা অতটাও কিছু গুরুতর ছিল না, কারণ আগে থেকেই কী কবিতা আবৃত্তি করতে হবে সেটা বলে দেওয়া থাকত, সুতরাং বিচারকরা জানতেন প্রতিযোগীরা হয় এটা, না হয় ওটা বলবে। আমরা (আমি আর আমার বোন) অবশ্য এতসব কায়দাকানুনের মধ্যে যেতাম না, কারণ আমাদের মা-মাসীরা যাঁরা এইসব কম্পিটিশনে নিয়ে যেতেন, তাঁরা এসব ব্যাপারে বেশ ওল্ড স্কুল ছিলেন।

সে যাক। যে কারণে এ প্রসঙ্গের উপস্থাপনা করলাম আবার, তার উদ্দেশ্য হল গানের শুরুতে দেবব্রতর ন্যারেশনটুকু লক্ষ্য করা। দেবব্রতর গান মানেই হারমোনিয়াম, আর এক্ষেত্রে লক্ষ্য করে দেখবেন, সেটা বাজছে একটু উঁচু স্কেলে, যেন দেবব্রতর গলার গাম্ভীর্যের সাথে সঙ্গত করতে। যাঁরা ব্রততীর গলায় “আমিই সেই মেয়ে” কিংবা “যমুনাবতী” শুনেছেন, তাঁরা কিছুটা বুঝবেন। কিন্তু এর চাইতেও ভালো উদাহরণ হল, স্টিভন ফ্রাইয়ের গলায় শার্লক হোমসের অডিওবুক। এক সাক্ষাৎকারে স্টিভন বলছেন, উনি কিভাবে বইয়ের চরিত্রগুলো গলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ওঁর কথাতে বলি, ওয়াটসনের গলায় যেন একটা gravel রয়েছে (যেটাকে আমরা বাংলায় দানাদার, ভারী গলা বলে থাকি, খানিকটা ব্যারিটোন হয়ত বা) আর শার্লকের গলাটা তার চাইতে এক পর্দা উঁচুতে (কারণ হিসেবে আমার মনে হয়, গলা এক পর্দা উঁচু হলে তাতে হোমসের প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্ন সারকাজম খেলে ভালো)। তার মানে, উনি যখন ডার্টমুরের বর্ণনা দিচ্ছেন, তখন উনি কমপক্ষে তিনটে গলা ব্যবহার করছেন, একটা ওঁর নিজের, একটা ওয়াটসনের আর একটা শার্লক হোমসের। যাঁরা আমার মতন শার্লকপ্রেমী (এবং যাঁরা সবকটা গল্প উপন্যাস পড়েছেন), তাঁরা বুঝতে পারবেন আমার উত্তেজনাটা ঠিক কী ধরণের (গো টু অ্যামাজন শপিং -> প্রি-অর্ডার শার্লক হোমস অডিওবুক ন্যারেটেড বাই স্টিভন ফ্রাই -> অ্যাড টু কার্ট ইত্যাদি)।

সে যাক। লিখছিলাম দেবব্রতর গলা নিয়ে।

দেবব্রত বলে চলেন কিছুটা মজলিশি ঢঙে; কোন বয়সে রবীন্দ্রনাথ এ গানটি লিখেছিলেন, ব্রহ্মসঙ্গীত হিসেবে, এই সব। এই ন্যারেশনের শেষে কখন জানি হারমোনিয়াম বদলে যায় পিয়ানোয়, আর কথাগুলি ধীরে ধীরে মিশে যায় গানের স্থায়ীর সঙ্গে,

তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হবো নাকো পথহারা।
যেথা আমি যাই নাকো, তুমি প্রকাশিত থাকো,
আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা।

এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, হারমোনিয়ামের শেষে পিয়ানো ব্যবহার হয়েছে – অর্গ্যান নয়। অর্গ্যানের সুর আমার কানে একটা solemn ব্যাপার নিয়ে আসে, যেটা necessarily পিয়ানোর বৈশিষ্ট্য নয়। অর্গ্যান বলতেই আমার মনে পড়ে একটা বিশাল dome-shaped হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যাথিড্রাল, আর সমবেত প্রার্থনাসঙ্গীত। কখনো যদি আভে মারিয়া শুনে থাকেন, তাহলে খানিকটা বুঝবেন, অর্গ্যানের ব্যবহার কিভাবে হয়েছে। বিবেকানন্দ এক জায়গায় লিখেছেন, পাশ্চাত্য (খ্রীষ্ট) ধর্মের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য হল আমরা পাপী এবং পরমকারুণিক ঈশ্বর আমাদের পাপ হতে রক্ষা করবেন। হয়ত কিছুটা সে কারণেই, খ্রীষ্ট ধর্মসঙ্গীতের মধ্যে এই আকুলতাটুকু রয়ে গেছে (খানিকটা হিন্দু ভক্তিমার্গের মতন কি?), যে আবহটুকু অর্গ্যান তৈরী করে দেয়। যাঁরা “পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান – ডেড ম্যানস চেস্ট” সিনেমাটা দেখেছেন, তাঁদের হয়ত মনে আছে ডেভি জোন্সের পাইপ অর্গ্যান বাজানোর মুহূর্তটুকু। বাইরে উত্তাল সমুদ্র, ঝড়ে উথাল-পাথাল, তারই মধ্যে ডেভি জোন্স বাজিয়ে চলেছে অর্গ্যান। তার হৃদয় ক্যালিপসোর, আর এই ঝড় তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ক্যালিপসোর কথা। সে সুতীব্র বেদনা প্রকাশ করার কাজটুকু পরিচালক ওই তীব্র অর্গ্যানের সুর দিয়েই ছেড়েছেন, ও জিনিস ভাষায় প্রকাশ করা যায় না বলে।

ব্রাহ্মধর্ম, তথা ব্রহ্মসঙ্গীত কিন্তু মূলগতভাবে আলাদা। ব্রাহ্মধর্মের অন্তর নিরাকার বৈদান্তিকের, কিন্তু বাহ্যরূপ পাশ্চাত্যের। তৎকালীন (এবং সমকালীন) হিন্দুধর্ম ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আচারসর্বস্ব, আর সে কারণে ইংরেজদের কাছে এই “হীদেন” হিন্দুধর্ম (দর্শন নয়) খানিকটা অবজ্ঞার পাত্রও বটে। ব্রাহ্মধর্মের প্রবক্তারা যেহেতু সমাজের এলিট শ্রেণী, এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকে আলোকিত, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন রীতি অনেকাংশে ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের দ্বারা অনুপ্রাণিত (রামমোহন, দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ), এবং সেই ধারণা অনুসারে, ব্রাহ্ম উপাসনাগৃহও অতিশয় সাদামাটা এবং আড়ম্বরহীন। সত্যজিৎ রায় তাঁর “যখন ছোট ছিলাম” বইয়ে লিখে গেছেন ব্রাহ্ম উপাসনা পদ্ধতির কথা, আর রবীন্দ্রনাথের “জীবনস্মৃতি” তো আছেই (সেসব কথা খানিক অনাবশ্যক বোধে বাদ দিচ্ছি)।

দেবব্রতর এই ন্যারেশন খানিকটা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। বীরেন্দ্রর উপস্থাপনায় বীররসের আধিক্য, তিনি অসুরদলনী দেবীর আবাহন করছেন “খড়্গিনী শূলিনী ঘোড়া/ গজিনী চক্রিনী তথা/ শঙ্খিনী যাপিনী বাণ…।” অপরপক্ষে দেবব্রত স্থির, শান্ত, কিছুটা যেন relaxed-ও, খানিকটা যেন পড়ন্ত বিকেলে, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের কোনো এক ক্লাসরুমে ডেস্কে সামান্য হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষক পড়িয়ে চলেছেন শেক্সপীয়র, আর গোটা ক্লাস মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছে, যেন পলক পড়লেই সব থেমে যাবে। তাঁর কথা শেষ হয়, আর কোন এক সময়ে পিয়ানো এসে পড়ে, গোটা ব্যাপারটার মধ্যে। পিয়ানো, একটা আশ্চর্য জিনিস। দেবব্রত খানিক থেমে শুরু করেন, যেন ভাসিয়ে দিচ্ছেন গলা,

শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা,
শুধু যাওয়া…।

আমি নিজে নাস্তিক। সাকার, নিরাকার, কোনো ভগবানেই আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু এ গান যখন শুরু হয়, তখন চরাচর থেমে যায় কোন মন্ত্রবলে। গাছের পাতাটিও নড়ে না, যেন হেমন্ত, পিয়ানোর এলোমেলো কয়েকটা নোটের পর শুরু করেছেন,

আমি গান শোনাবো একটি আশা নিয়ে,
সে গান যেন তোমার ভালো লাগে…।

কিন্তু না, তাও তো নয়! ততদিনে দেবব্রত জেনে গেছেন, বিশ্বভারতী তাঁকে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে নিষেধ করেছে। এ আঘাত তিনি যে কিভাবে সামলেছেন, সে কথা আমরা জানি, যখন ঝড়ের রাতে একলা, অভিমানী মানুষটি, গাইতে থাকেন –

জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে!

দেবব্রত কোনো শ্রোতার তোয়াক্কা করেন না, কেবল ওই শুরুর ন্যারেশনটুকু বাদ দিয়ে। ঐটুকুই। ওঁর দায় তারপরে শেষ। তারপর, শুধুমাত্র গেয়ে চলেন রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে, আর আমি বসে থাকি, স্থির। শুনে চলি, গান শেষ হয়েও শেষ হয় না। ভাবি, বাংলা আর ইংরেজি ভাষার গোটা ভোক্যাবুলারিও যথেষ্ট নয়, যা বলতে চেয়েছিলাম তার জন্যে। পুরো ব্যাপারটা যেন ম্যাজিক।

অবাঙমনসোগোচর, বোঝে প্রাণ বোঝে যার।

(ঋণস্বীকার: Google, Youtube ও অন্যান্য)

Advertisements