“নো নো নো নো নো, দ্যাটস ফেইক। আই ক্যান নত আন্দারস্ট্যান্ড, হাউ ইউ গাইজ লিসন তু অল দিজ বিউটিফুল সংস, অ্যান্ড নত ইন দেয়ার ওরিজিনাল ভার্শান”, বলছিল লুসিয়া। লুসিয়া পুয়েন্তে, চল্লিশের কোনো একটা দিকে বয়স, মেহিকানা, শান্তিনিকেতনে পড়েছে, অসম্ভব রবীন্দ্রনাথ অনুরাগিণী, কেরালায় কয়েক বছর কাটিয়েছে, ফ্লুয়েন্ট মালয়ালম বলতে পারে, বাংলা জানে একটু আধটু (“আর একটু বেশি দিন থাকলে, বুঝলে, শিখে নিতাম বাংলা। কী সুন্দর ল্যাঙ্গুয়েজ! অ্যান্ড টেগোর সংস, দোজ আর মাই ফেভারিট”), আর অনবরত হাসে। ল্যাটিন রক্ত বইছে শরীরে, দুম করে রেগেও যায়, আর রেগে গেলে ল্যাটিনাদের যে ঘাঁটাতে নেই, সেটা…

পাশে হাঁটছে টমাস, আমার তখন-রুমমেট। সেও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছে দেখলাম। মিনমিন করে বললাম “আচ্ছা, এই যে এখানে লোকজন বলিউড মিউজিক শোনে, আর সেটাকেই ইন্ডিয়ান মিউজিক বলে জানে, সেটাও তো একই রকম ব্যাপার না খানিকটা? তাহলে শোধবোধ, কি বলো?”

লুসিয়া দেখলাম একটু ঠান্ডা হল। তারপর বলল, “সে তো সব দেশেই অমন হয়। আমার ভয়ানক রাগ হয় এইসব অসাধারণ মিষ্টি গানগুলোকে এইভাবে বুচার করলে। এই আমেরিকানগুলো…”

শুরু হয়ে গেল আমেরিকানদের মুণ্ডুপাত। টমাস, আমার অন্যতম ক্লোজ বন্ধু, এক মধ্যবয়সী সাদা আমেরিকান; কিন্তু মনেপ্রাণে এশিয়ান। মাঝে মধ্যে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় ওর এশিয়া এবং এশিয়ানদের প্রতি ভালবাসা, যেটা খানিক বিরক্তিকর, সেও যোগদান করেছে। আমি বেগতিক দেখে বললাম – “তা বেশ। কিন্তু ইয়ে, আমার এই Chingónized ভার্শনটাই বেশি ভালো লাগে।” লুসিয়ার মুখের দিকে চেয়েই ঝটপট যোগ করলাম “মানে এই কমার্শিয়াল ভার্শনগুলোর মধ্যে আর কি!”

আমরা হাঁটছিলাম স্ট্যান শেরিফ সেন্টারের পাশের পার্কিং লটের মধ্যে দিয়ে। স্ট্যান শেরিফ সেন্টার হল ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াইয়ের স্টেডিয়াম। সেখান থেকে হেঁটে বড় রাস্তায় পড়লাম, লুসিয়াকে বাড়িতে পৌঁছে দেবার জন্যে। হাঁটতে হাঁটতে লুসিয়া বলল, “কখনো পারলে এই গানটার পঞ্চাশের দশকের rendition টা শুনো। বুঝবে।”

আমি কিছু না বলে মাথা নাড়লাম। বেশ বুঝতে পারছি, লুসিয়া নস্টালজিক হয়ে পড়েছে। ব্যাপারটা খানিকটা “আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা”-র মধ্যে ইলেকট্রিক গীটার আর ড্রাম ঢোকানোর মতোই বেদনাদায়ক। কিন্তু আমি একে মিলেনিয়াল, তায় বিদেশী, তার উপর ছোটবেলা থেকে হলিউডের রঙিন কাঁচে দুনিয়া দেখা আনকালচার্ড ছোঁড়া, আমার পক্ষে সামান্য empathize করা ছাড়া আর কিছু করা সম্ভব নয়।

প্রথম এই গানটা (বলা ভালো সুরটা) শুনেছিলাম গীটারে। আন্তোনিও বেন্দেরাস, একটা সদ্য তৈরী হওয়া গীটারে বাজাচ্ছেন এলোমেলো। ক্যামেরায় প্রথমে ওঁর মুখ বাদ দিয়ে দেখাচ্ছে, গীটারটা হাতে ধরে পরখ করছেন কিরকম সুর বেরোয়। কয়েক সেকেন্ড বাজিয়ে মাথা নাড়লেন গীটার প্রস্তুতকারকের দিকে, খুশি হয়েছেন দু’জনেই। তারপরে পেছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে বাজাচ্ছেন, আর গীটারের সাথে সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকেও বাজছে, La Malagueña, যেটাকে গোটা দুনিয়া Malagueña Salerosa নামেও চেনে। লম্বা চুল চোখের উপর এসে পড়েছে, পরণে কালো জ্যাকেট, ট্রাউজার, আর স্পার বসানো কালো জুতো, বেন্দেরাস আর “এল মারিয়াচি” তখন আমার কাছে সমার্থক। নব্বইয়ের গোড়াতে সিক্যুয়েল “দেসপেরাদো” আর ২০০৩ এর “ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মেক্সিকো” দিয়ে যার শেষ। সেই দু’হাজার তিন, যে সময়ে হোস্টেল থেকে আমাদের জনা কয়েক বন্ধু, তখন ক্লাস নাইনের শেষ বা টেনের শুরু, পালিয়ে গিয়ে “ওয়ান্স আপন এ টাইম” দেখতে গেছিল, আর সেই অপরাধে সাসপেন্ড হয়েছিল, সেই সিনেমা। লাতিন আমেরিকা মানেই আমার কাছে তখন, এখনো, কিউবা-চে-ফিদেল-আলেন্দে, লাতিন আমেরিকা মানে এল মারিয়াচি, সালসা-বাচাতা-ট্যাঙ্গো আর আগুন-জ্বালানো ল্যাটিনা, যে আগুনের আঁচ ততদিনে আমার চেনা। “কিল বিল” সিনেমায় উমা থুরম্যান আর লুসি লিউয়ের শেষ লড়াইয়ের কথাটা মনে আছে? তা হলে বুঝবেন  Chingón কী জিনিস। রবার্ট রডরিগেজ, জন্মসূত্রে টেক্স-মেক্স এই মারিয়াচির ব্যান্ড হল Chingón, যার মানে লিটারালি “shit”, এই সমস্ত মারিয়াচি গানের কভার করেছেন, ইলেকট্রিক গীটারে। সে জিনিস শুনেছি আর মনে মনে ভেবেছি, এভাবে কোনোদিন গীটার বাজাতে যদি পারি, জীবন সার্থক! এই গানটা যে আমায় শুনিয়েছিল ইউটিউবে, দু’হাজার চোদ্দ সালে, তখনো জানতাম না এই গানটার নাম, শুধু সুরটা ছাড়া, তার একঢাল কালো চুল, গায়ে ল্যাটিন রক্ত আর কাজলকালো চোখ। তার নাম বলা মানা। আমাকে বলেছিল সে, এই গানের সাথে সে তার quinceañera-য় নেচেছিল, তখন তার পনেরো বছর বয়স। এখন ভাবি, আমার কী ভাগ্য, জীবনে সিনেমার মূহুর্তগুলোও এমনি করে আসে! এ গান এক ব্যর্থ প্রেমিকের, যে মালাগা থেকে আসা এই সুন্দরীর উদ্দেশ্যে বলছে, আমি তোমার জন্যে পাগল, কিন্তু আমি জানি আমি গরীব, সেজন্যে তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করছ, আমি বেশ বুঝতে পারছি তা। এই কথা আমাদের সকলের, যারা প্রেমে ব্যর্থ হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছি, আবার গুছিয়ে নিতে চেয়েছি জীবনটাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতন লুপে চালিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা শুনে গেছি গানটা হেডফোনে, যেন চারপাশে সব থেমে গেছে, সব মিথ্যে, শুধু সত্যি বলতে La Malagueña, মালাগা-র সেই সুন্দরী। আর সব মিথ্যে, স-অ-ব।

মনে পড়ল, লুসিয়ার সাথে আমার প্রথম আলাপের কথা। আমি ইউনিভার্সিটির প্যারাডাইস পামস্ ক্যাফেটেরিয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে, দরজার কাছটায়, কফির অর্ডার করব, গায়ে মেক্সিকান সোয়েটার (সদ্য মেক্সিকো ঘুরে ফিরেছি, সেখান থেকে কেনা)। হঠাৎ শুনি কে জানি জিজ্ঞেস করছে, “পেরদোন? এরেস মেহিকানো?” (এক্সকিউজ মি, আর ইউ মেক্সিকান?) আমি ঘাড় নাড়লাম, “নো।” সাথে সাথে হেসে উঠল লুসিয়া, “দেন ইউ আর ইন্ডিয়ান।” আমিও হাসছি, “কি করে বুঝলে?” বলল, “আরে আমি ঠিক বুঝতে পারি। এতদিন ভারতে কাটিয়েছি…” ব্যস, সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্ব শুরু। হাওয়াই ছেড়ে চলে আসার আগে আমাকে লুসিয়া নেমন্তন্ন করেছিল, “পরের বার মেক্সিকো আসার আগে আমাকে কিন্তু অবশ্যই জানাবে।” আমি কথা দিয়েছি, জানাবো। বন্ধুভাগ্য আমার চিরদিনই ভালো যদিও, দেখি, কোনোদিন যদি পারি, হবে হয়ত…।

তারপর চলে এসেছি হাওয়াই ছেড়ে, সেও কতদিন হয়ে গেল। কিন্তু মালাগা-র সেই সুন্দরী, যার কাজলকালো চোখ, গরীব বলে যে প্রত্যাখ্যান করল সেই মারিয়াচিকে, সে আমার স্মৃতিতে রয়ে গেছে। এখনো চোখ বুজলেই দেখতে পাই, লাল একটা স্কার্ট তার পরণে, আর কালো পোশাকে ঢাকা তার ঊর্ধাঙ্গ, সে তার ডান হাত ছড়িয়ে দিয়েছে হাওয়ায়, আর সপাটে ঘুরেছে একপাক, মরুভূমির বালির ঝড়ের মত। তার একঢাল কালো চুল সাপের মতন ফুঁসে উঠেছে, তার প্রতি পদক্ষেপে উড়ে চলেছে ধুলো। আর একপাশে বসে, জীর্ণ গীটারে সুর তুলেছে গরীব মারিয়াচি, প্রত্যাখ্যাত কিন্তু ধীর, সে জানে তার বাজনার আয়ু যতক্ষণ, ততক্ষণই আয়ু এই নাচেরও, তাই সুরের বাঁধনে সে বেঁধে রাখতে চায় সেই অসামান্য বিদ্যুৎশিখাকে, যার দেহে গোলাপের সারল্য, আর ঠোঁটে এক মহাসাগর তৃষ্ণা, আর সে তৃষ্ণা স্থান কালের নিয়ম ছাড়িয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সকলকে। সে জিনিস স্বর্গের পারিজাতের মতন নিষ্পাপ, মদিরার নেশার মত আকর্ষক, সে তৃষ্ণা যার একবার এসেছে, তার আর রেহাই নেই, মরুভূমিতে জলের আশায় ঘুরে বেড়ানো ছাড়া। মরীচিকার সন্ধান মাঝে মধ্যে মেলে, আর সে আশায় গীটারে সে আবার তোলে সুর, যদি আবার কখনো সে সুন্দরীর দেখা মেলে তার। কারণ সে জানে, আবার কোনোদিন দপ্ করে জ্বলে উঠবে তার চোখ, আর লাল এক ঘূর্ণি তুলে সে শুরু করবে তার নাচ, যে নাচ তার রক্তে। আর গোটা দুনিয়া থেমে যাবে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে। সে নিঃশ্বাস কখন পড়বে, কেউ জানে না, কেউ জানে নি আজও।

ঋণস্বীকার: গুগল, ইউটিউব ও অন্যান্য।

Advertisements